ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতি
ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এক নির্ভেজাল জীবন বিধান। ইসলামের পরিচয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন- اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰہِ الۡاِسۡلَامُ-অর্থাৎ ‘ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ইসলামই একমাত্র দ্বীন। (সূরা আল ইমরান : ১৯)আমরা জানি, আল্লাহর দেয়া এই ইসলাম, এই জীবন বিধানে কোনো খুঁত নেই। ঘাটতি নেই। এটা পরিপূর্ণ। পবিত্র কালামে হাকিমে আল্লাহ সুবহানাহু ওতা’আলা বলেন,اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ؕ فَمَنِ اضۡطُرَّ فِیۡ مَخۡمَصَۃٍ غَیۡرَ مُتَجَانِفٍ لِّاِثۡمٍ ۙ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۳﴾ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য একমাত্র দীন রূপে মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়িদা : ০৩) এরপর আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে এ-ও জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম ছাড়া যদি অন্য কোনো মত-পথ ও মতাদর্শ কিংবা তন্ত্রমন্ত্র আমরা খুঁজি, তবে আল্লাহর কাছে কস্মিনকালেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুতে শান্তি আর স্বস্তি চায়, তারা ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারেই পড়ে থাকবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন- وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম সন্ধান করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত ।’ (সূরা আলে ইমরান : ৮৫)। প্রথম আয়াতটা খেয়াল করুন (সূরা আল ইমরান : ১৯), সেখানে আল্লাহ তাঁর মনোনীত দ্বীনের ক্ষেত্রে শুধু দ্বীন (دين) বলেননি। বলেছেন আদ-দ্বীন ( الدين)। دين অর্থ একটি পথ, একটি আইন, একটি দ্বীন-ধর্ম। আর আদ-দ্বীন (الدين) অর্থ পথটি বা আইন-বিধানটি। এখন কেউ যদি শুধু পথ বা আইন-বিধান বলে, তবে তা যেকোনো পথ, যেকোনো বিধান হতে পারে। আর যদি তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, তার মানে এই পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ একজন পথিকের জন্য নিরাপদ হতে পারেনা। আরবি ব্যাকরণে মারেফা(معرفة) ও নাকেরা(نكرة)নামে একটা নিয়ম আছে। মারেফা মানে নির্দিষ্ট। নাকেরাহ মানে অনির্দিষ্ট। তো আল্লাহ দ্বীন (دين) শব্দটিকে নাকেরা না কওে আলিফ লাম যুক্ত করে আদ-দ্বীন (الدين) বলে মারেফা করেছেন, তথা নির্দিষ্ট করেছেন। মানে আমাদের জন্যে এই একটি মাত্র দ্বীন। এই একটি মাত্র পথ। এই একমাত্র আইন বা বিধান।দ্বীন এবং আদ-দ্বীনের মধ্যে পার্থক্য প্রসঙ্গে ইমাম মওদূদী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইংরেজি ভাষায় This is a way (এই একটি পথ)-এর পরিবর্তে This is the way (এ একমাত্র পথ) বলায় অর্থের দিক দিয়ে যতোখানি পার্থক্য সৃষ্টি হয়, ‘দীন’ (دين) এবং ‘আদ-দীন’ (الدين) শব্দের মধ্যেও অর্থের দিক দিয়ে ঠিক ততোখানি পাথর্ক্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ কুরআন একথা বলছে না যে, “ইসলাম আল্লাহর নিকট একটি ( মনোনীত ) ধর্ম।” বরং তার দাবি, “ আল্লাহর নিকট ইসলামই একমাত্র প্রকৃত, বিশুদ্ধ ও নির্ভুল জীবনব্যবস্থা বা চিন্তা ও কর্মের প্রণালি।” (একমাত্র ধর্ম : পৃষ্ঠা -০৭) যেহেতু এটাই আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র নির্ভুল জিবন ব্যবস্থা, সেহেতু এছাড়া অন্য কোনো আইন, অন্য কোনো নিয়ম-পদ্ধতি, বিধি-বিধান সঠিক ও অনুসরণযোগ্য হতে পারেনা আমাদের জন্যে। দ্বীন (دين) শব্দের অর্থ প্রসঙ্গেও সাঈয়েদ মওদূদী (রহঃ) চমৎকার একটা কথা বলেছন। তিনি বলেন, “দ্বীন হচ্ছে জীবন-যাপনের এমন পন্থা, যা মানুষের জীবনে অনুসরণ করা যেতে পারে।” আর ঠিক সে কারণেই আল্লাহ দ্বীনের (دين) সাথে আমাদের জন্য (পথ বা বিধি-বিধান হিসেবে) আল-ইসলামকে (الاسلام) নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এবং এই ইসলামকেও শুধুই পথ হিসেবে না, একমাত্র পথ হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখন দেখুন, যদি আল্লাহ তাআলা একমাত্র পথ হিসেবে ইসলামকে আমাদের জন্যে নির্ধারণ করে দেয়ার পরও কেউ অন্য পথে যায়, তবে তার সে যাওয়াটা নিরাপদ হবে না। হয়তো যেতেও পারে, তবে ঝুঁকি আছে। আর ঝুঁকির বিষয়াদি বাদ দিলেও আল্লাহ কিন্তু কোনো পথই রাখেননি আমাদের জন্য ইসলাম ছাড়া। আর সে কারণেই দ্বীনের (دين) সাথে আলিফ লাম যুক্ত করে আদ-দ্বীন ( الدين) বলেছেন। এবং সাথে জুড়ে দিয়েছেন আল-ইসলামকে (الاسلام)। মানে হলো এই একটিই পথ। এই পথ ছাড়া অন্য কোনো পথই নেই আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নির্দিষ্ট করে দেওয়া এই একমাত্র পথ ছেড়ে অন্য কোনো পথে যাবার চিন্তা করাটাই তো বোকামি আমাদের জন্য, কারণ এছাড়া আমাদের জন্য আর কোনো পথই রাখেননি তিনি। এখন আল্লাহর পথ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা মানেই বিপদ ডেকে আনা। ক্ষতিকে বরণ করে নেয়া। ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারে পড়ে থাকা। যেহেতু আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের জন্যে একমাত্র দ্বীন হিসেবে, জীবন চলার একমাত্র পথ হিসেবে ইসলামকে নির্ধারিত করেছেন, সেহেতু এরমধ্যে জাগতিক সবকিছুই আছে। জীবনে বাঁচতে হলে, চলতে হলে যা যা প্রয়োজন সব কিছুই এই ইসলামে আছে। আর ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু অন্বেষণ করলে বা অবলম্বন করলে যেহেতু আমরা আমাদের চিরস্থায়ী আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো, সেহেতু আমরা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মতাদর্শকে গ্রহণ করতে পারি না, পারি না কখনোই অন্য কোনো বিধানের দিকে ঝুঁকে পড়তে। সেটা হোক রাজনীতির নাম করে, হোক তা জ্ঞানের নাম করে কিংবা সাহিত্য-সাংস্কৃতির নাম করে, অথবা সভ্যতা বিনির্মাণের নাম করে। আমাদেরকে সবকিছু ইসলাম থেকেই নিতে হবে, যেহেতু ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আজ আমাদের মাঝে ইসলাম বিজয়ীর আসনে সমাসীন নেই। তা হোক সামাজিকভাবে, অথবা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে, কিংবা অর্থনৈতিকভাবে; এক কথায় কোনোভাবেই এই দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীন কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। এই অপ্রতিষ্ঠিত ইসলামকে পুনরায় পৃথিবীর জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দ্বীনের পরিপূর্ণ বুঝওয়ালা ঈমানদারেরা ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়। নিজেদের জীবনের মিশন এবং ভিশন হিসেবে আল্লাহর দেয়া আদ-দ্বীনকে গ্রহণ করে নেয়। এখন যেহেতু একা একা কোনো মতবাদকে, কোনো চিন্তাকে পূর্ণতা দেয়া যায় না, যায় না করা প্রতিষ্ঠা। সেজন্যেই আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ইসলামী আন্দোলনের মহান মুজাহিদগণ সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ হয়। ইসলাম যেমন ব্যাপক। ইসলামী আন্দোলনও এক ব্যাপক-বিস্তৃত চিন্তা-দর্শনের নাম। ইসলাম যতোটা ব্যাপক, ইসলামী আন্দোলনের পরিধিও ততোটাই ব্যাপক। ইসলামী আন্দোলন কোনো ক্ষুদ্র জাগতিক আন্দোলনের নাম নয়। ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন বইতে আন্দোলনের সংজ্ঞায় শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহঃ) বলেন, “প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুকে অপসারণ করে সেখানে নতুন কিছু কায়েম বা চালু করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, প্রাণান্তকর চেষ্টা, তথা সুনিদির্ষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম সাধনার নামই আন্দোলন।” এখন যারা জাগতিক আন্দোলনের পেছনে ছোটে, তারা হয়তো নির্দিষ্ট একটা বিষয়ের জন্যেই ছোটে। নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্য পূরণের জন্যই তারা তাদের আন্দোলন পরিচালনা করে। সেই নির্দিষ্ট বিষয় হাসিল করার জন্যে নীতি-নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস ও আদর্শকে পদদলিত করতেও কুণ্ঠিত হয় না। তারা কেউ হয়তো রাজনৈতিক মাঠে বিজয়ী হয়ে স্রেফ ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হবার জন্যেই আন্দোলন করে। কেউ হয়তো বা অর্থনৈতিক বিষয়ের কোনো পাওনা বুঝে পাবার জন্যেই আন্দোলন করে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মুজাহিদগণ কখনোই কেবল দুনিয়াবী নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ে সফলতা পাবার জন্যে উদ্গ্রীব থাকে না। আবার কোনো একটা দিকে সফলতা পাবার পর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা সীমালঙ্ঘনও করে না। এমনকি নির্দিষ্ট বিষয়ের পরাজয়েও মুষড়ে পড়ে না। যাইহোক, ইসলামী আন্দোলন যেহেতু এক ব্যাপক-বিস্তৃত চিন্তা-দর্শনের নাম, ইসলাম যেহেতু পরিপূর্ণ এক জীবন বিধানের নাম,
ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতি Read More »
