বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে করণীয়
ইসলামী আন্দোলন তথা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর হক আদায় করার জন্য আমরা ইসলামী সংগঠনভুক্ত হয়েছি। সংগঠনের সাথে মিলেমিশে, সংগঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রদত্ত ফরজ ইবাদাত-জিহাদের দায়িত্ব পালনের প্রচেষ্টায় সংগঠনের সাথে মিলে কাজ করতে গিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে নানাবিধ দায়িত্ব আমাদের উপরে দেওয়া হয়। সেসব দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা চেষ্টা করি। মূলত দায়িত্ব পালনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে আমাদের রব আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করতে চাই। আর আল্লাহ খুশি হলে পুরস্কারস্বরূপ তিনি আমাদেরকে পরকালে জান্নাত দেবেন। অতএব এক্ষেত্রে জান্নাতপ্রাপ্তি মুখ্য একটি চাওয়া। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, জান্নাত পাওয়ার জন্য থানা সভাপতি হওয়ার কোনো শর্ত নেই, ওয়ার্ড সভাপতি হওয়ার কোনো জরুরিয়ত নেই, উপশাখা বা কেন্দ্রের দায়িত্বশীল হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; বরং একজন সাধারণ কর্মীও যদি খুলুসিয়াতের সাথে সর্বোচ্চ আন্তরিকতাসহ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে এবং আল্লাহ তায়ালা তার সে প্রচেষ্টা কবুল করে তাকে জান্নাতে ঠাঁই দেন, তাহলে সেটাই তার সফলতার কারণ হবে। অপরপক্ষে দায়িত্ব যত বড় হয়, আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কাঠগড়া ও পরিসর তত বড় হয়। আমাদের মধ্যে শঙ্কা আর ভয় বাড়ে যে, আমরা এই দায়িত্বের পরিসরের আলোকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা করতে পারবো কিনা! আবার এটাও সত্য যে, ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকেই মঞ্জুর হয়। এ দায়িত্ব যেমনিভাবে চেয়ে নেয়ার সুযোগ নেই, একইভাবে এই দায়িত্ব কারও উপর আসলে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই আমাদের জন্য। বরং দায়িত্ব চলে আসলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে চেয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে আমরা বাধ্য। শঙ্কার দিকের পাশাপাশি আরেকটি আশার দিক এখানে রয়েছে। হতেও পারে, আরোপিত দায়িত্ব খুলুসিয়াতের সাথে পালনের প্রচেষ্টা দেখে আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি খুশি হয়ে যাবেন এবং মেহেরবানি করে আমাদেরকে মাগফিরাত দান করবেন। হতেও পারে, এ দায়িত্ব পালন পরকালে নাযাতের জন্য সহায়ক হবে, এ দায়িত্বই পরকালে নাজাতের উসিলায় পরিণত হবে। অতএব শঙ্কা-ভয় ও আশা-প্রত্যাশা এ উভয় দিককে একসাথে ধারণ করে আমাদের উপর চলে আসা দায়িত্ব পালনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই হচ্ছে আমাদের কর্তব্য। আমরা ইসলামী আন্দোলন করি মৌলিক দু’টি পুরস্কারের জন্য। সূরা সফের ৯-১৩ নাম্বার আয়াত খেয়াল করলে আমরা সে দু’টি পুরস্কারের কথা জানতে পারি। প্রথম ও মুখ্য পুরস্কার হচ্ছে জাহান্নাম থেকে বাঁচা, আল্লাহর মাগফিরাত পাওয়া, জান্নাতে যাওয়া ও জান্নাতের মধ্যে উত্তম আবাসে থাকার সুযোগ। যেটাকে এক কথায় বলা যায় ব্যক্তির পরকালীন মুক্তি তথা জান্নাতপ্রাপ্তি, যেটাকে আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বড় পুরস্কার তথা ‘ফাউঝুন আযিম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় পুরস্কার হচ্ছে আল্লাহর সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্যের মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়। এই দুই পুরস্কারের জন্যই আমরা ইসলামী আন্দোলন করি। তবে অবশ্যই দ্বিতীয় পুরস্কারের জন্য আমরা প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাই, মূলত তার মধ্য দিয়ে আল্লাহকে খুশি করে তাঁর নিকট থেকে প্রধান পুরস্কার স্বরূপ জান্নাত প্রাপ্তির জন্য। তাই ইসলামের বিজয়ের জন্য প্রচেষ্টা আমাদেরকে সেই পথেই চালাতে হয়, যে পথের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন ও রাসূলুল্লাহ সা. সে অনুসারে প্রচেষ্টা চালিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন, কারণ এটিই হচ্ছে অনুমোদিত পথ, যে পথে চলে প্রথম পুরস্কার পাওয়া সম্ভব ইনশাআল্লাহ। আমরা বিপ্লবের জন্য কাজ করছি। একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমাদের হৃদয়ের মধ্যে স্বপ্ন এঁকে নিয়েছি। সংগঠন ইসলামী বিপ্লব তথা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, সংগঠনের একজন কর্মী হিসেবে সে প্রত্যাশিত বিপ্লবে আমাদের প্রত্যেকের অংশগ্রহণ কতটুকু হবে? সেটি বুঝার জন্য একটি যুদ্ধের ময়দানের উদাহরণ দিতে চাই। একজন সেনাপতি যুদ্ধে বিজয়ের জন্য যুদ্ধের ময়দানে নানানভাবে সৈন্যবাহিনীকে সাজান। কিছু সৈন্যকে তিনি সম্মুখ সমরের জন্য নিয়োজিত করেন, কিছু সৈন্যকে তীরন্দাজ বাহিনীর অংশ হিসেবে নিয়োজিত করেন, কিছু সৈন্যকে অশ্বারোহী বাহিনীর অংশ হিসেবে নিযুক্ত করেন, কিছু সৈন্যকে তিনি পদাতিক বাহিনীর অংশ হিসেবে নিযুক্ত করেন, কিছু সৈন্যকে তিনি গিরিপথে দাঁড় করে দেন যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে যেন তারা না নড়ে যায়, আবার কিছু সৈন্যকে তিনি রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রেখে দেন যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন তারা সেখান থেকে না সরে যান। এখন যাদেরকে যেখানে দায়িত্ব দেওয়া হলো তারা যদি সেই নির্দেশনার আলোকে নিজ নিজ জায়গাতে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন তাহলে তাদের সবার দায়িত্ব পালনের প্রচেষ্টার যোগফল হিসেবে সেই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়; কিন্তু অপরপক্ষে যাদেরকে যেখানে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা যদি নিজ নিজ জায়গায় দায়িত্ব পালন না করে তাদের স্থান পরিবর্তন করে ফেলে, যেমন যাদেরকে গিরিপথে দাঁড় করে দেয়া হয়েছে তারা যদি নির্দেশনা বা অনুমতি ছাড়াই সম্মুখ সমরে এসে যুদ্ধ শুরু করে দেন অথবা যাদেরকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে তারা যদি নির্দেশনা বা অনুমতি ছাড়াই সম্মুখ সমরে এসে যুদ্ধ শুরু করে দেন তাহলে হয়ত সংঘর্ষ অনেক বেশি হবে, দেখে মনে হবে আমরা বোধ হয় প্রচণ্ড আকারে যুদ্ধ করতে পারছি কিন্তু সেই যুদ্ধে বিজয়ের সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে। এই উদাহরণ থেকে যে শিক্ষা নিতে চাই সেটি হচ্ছে গোটা বিপ্লবের জন্য সংগঠন পরিকল্পিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনের কর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যেখানেই আমাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হোক না কেন, সেটি উপশাখায় হোক অথবা কেন্দ্রেই হোক, মূল সংগঠনে হোক অথবা পার্শ্ব সংগঠনেই হোক, সেখানে নিজেকে ইসলামের উপর অটল অবিচল রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জায়গাটিতে সংগঠনের নির্দেশনার আলোকে, সংগঠনের পরিকল্পনার আলোকে সে জায়গাটিকে পরিচালনা করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো এবং অন্যান্য জায়গার জন্য দোয়া করা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার সুযোগ থাকলে তা করা। আমাদের গোটা দেশের যেই জনশক্তি আল্লাহর মেহেরবানিতে আমরা পেয়েছি সবাই মিলে আমাদের কাজ হচ্ছে গোটা সংগঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। সবাইকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানোর স্বার্থে সংগঠনকে বিভিন্ন স্তরে সাজানো হয়েছে। যেমন কেন্দ্র, শাখা, থানা, ওয়ার্ড/ইউনিয়ন ও উপশাখা। কয়েকটি উপশাখাকে দেখভাল করার জন্য ওয়ার্ড, কয়েকটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নকে দেখভাল করার জন্য থানা, কয়েকটি থানাকে দেখভাল করার জন্য শাখা, শাখাগুলোকে সরাসরি দেখভাল করে কেন্দ্র। কেন্দ্রের নির্দেশনা অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক, শাখা, থানা, ওয়ার্ডের মধ্য দিয়ে সংগঠনের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সহজেই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব আবার সংগঠনের প্রান্তিক পর্যায়ে থেকে তাদের কথা সহজেই কেন্দ্রীয় সভাপতির কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সকল জনশক্তিকে যথার্থভাবে কাজে লাগানোর এই প্রক্রিয়ার নামই হচ্ছে সাংগঠনিক কাঠামো। সংগঠনের প্রত্যেকটি স্তর যদি যথাযথভাবে তাদের জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলেই তাদের সবার কাজের যোগফল হিসেবে কেন্দ্রীয় সংগঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে ইনশাআল্লাহ। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সংগঠনের বিভিন্ন স্তরকে একই সূত্রে গেঁথে কাজে লাগানোর কী প্রক্রিয়া হতে পারে সেটিই এ পর্যায়ে বর্ণনা করার জন্য চেষ্টা করছি। প্রয়োজনীয় ধাপসমূহ- – পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। – পরিকল্পনা অধস্তন শাখাগুলোর মধ্যে বন্টন করে দেওয়া। (যেমন: কেন্দ্রে যদি পরিকল্পনা নেওয়া হয় যে, এ বছর যেসব কলেজে সংগঠন নেই, সেগুলোর মধ্য থেকে ১০% কলেজে সংগঠন বৃদ্ধি করা হবে অর্থাৎ ন্যূনতম উপশাখা বৃদ্ধি করা হবে।
বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে করণীয় Read More »



