বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ

শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত

শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত

২০২৪ সালের ৫ জুন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা ৯ম ও ১০ম গ্রেডের সকল সরকারি চাকরিতে সকল ধরনের কোটা বাতিল পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলন আবার নতুনভাবে আলোচনায় আসে। অবৈধ সরকারের অবৈধ কোর্টের রায়ের প্রতিবাদে তৎক্ষণাৎ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায় আপামর ছাত্রজনতা। ধীরে ধীরে আন্দোলন বড় হতে শুরু করে।সরকার আন্দোলন বন্ধ করার জন্য আপিল বিভাগের মাধ্যমে ১০ জুলাই কোটা ইস্যুতে চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থার নাটক সাজায়। কিন্তু ছাত্রজনতা প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে থাকে।এক পর্যায়ে ১৫ জুলাইয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপর হামলে পড়ে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। ফলশ্রুতিতে কোটা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশের স্কুল কলেজসহ সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ১৫ জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে সারাদেশের মত ১৬ জুলাই ২০২৪ ইং তারিখ বিকালে চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে নগরীর মুরাদপুর মোড়ে।

শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখার সাথী ছিলেন এবং স্কুল পশ্চিম ওয়ার্ডের ওয়ার্ড সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, এইচ এস সি পরীক্ষার পর ভর্তি হয়েছিলেন ওমরগণি এম ই এস কলেজে অনার্স ১ম বর্ষে। সকালেও সময় কেটেছে তার সাংগঠনিক কাজের ব্যস্ততায়, বিকালে সংগঠনের নির্দেশনানুযায়ী কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবীতে সর্বদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী শহীদ শান্তও সেদিন যোগ দেয় উক্ত মিছিলে।
বিকাল ৩.০০টা থেকে শিক্ষার্থীরা মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নিলে ২নং গেট এর দিক থেকে অতর্কিত হামলা শুরু করে ছাত্রলীগ।হামলার একপর্যায়ে গুলি করা শুরু করলে বুকের ডান সাইডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত। পরবর্তীতে কিছু শিক্ষার্থীরা মিলে তাকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরার কথা ছিলো শান্ত, তাই তার মা নাস্তা তৈরী করে করছিলো আর ছেলে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলো, কিন্ত এই অপেক্ষার প্রহর যে ইতোমধ্যে অসীম হতে চলেছে তিনি গুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, তার ছোট মেয়ে শান্তর বোনের মাধ্যমে ফোন দিলো শান্ত এর মোবাইল ফোনে, কিন্ত ফোন বন্ধ। কিছুক্ষণ পর শান্তের দুইজন বন্ধু এসে শান্ত আহত হওয়ার কথা বলে তাদের সাথে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে গিয়ে যখন তিনি বুঝতে পারলেন তার একমাত্র ছেলে ফয়সাল আহমেদ শান্ত আর নেই সেখানেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে বেহুশ হয়ে পড়েন, জ্ঞান আসার পর তিনি থানা-পুলিশের বিভিন্ন জটিলতার পর রাত ২টা নাগাদ দেখতে পান বিকাল ৩টায় জীবিত বিদায় দেওয়া তার শান্তকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিথর দেহে শহীদ শান্ত হিসেবে। পোস্টমর্টেম না করার অনেক অনুরোধ করার পরেও তাকে পোস্টমর্টেম করে আওয়ামী পুলিশ, তার শৈশব কৈশোর কাটানোর স্থান চট্টগ্রামে জানাযা পড়তে দেওয়ার জন্য তার দায়িত্বশীলবৃন্দ, বন্ধু-বান্ধব অনেক চেষ্টা করলেও সেই সুযোগটুকুও দেওয়া হয়নি,
পুলিশী পাহাড়ায় তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার বিমানবন্দর থানার রহমতপুর গ্রামে। তার পিতা ফার্ণিচারের দোকানের কাজে আগে থেকেই গ্রামে থাকতেন, ছেলের শাহাদাতের সংবাদ শোনার পর তিনি ভেঙ্গে পড়েন, তার কাধে যে বহন করতে হবে পৃথীবীর সবচেয়ে ভারী তার নিজ সন্তানের লাশ। লাশ গ্রামে পৌছার পর তৈরী হয় এক শোকার্ত পরিবেশ, হাজারো জনতার অংশগ্রহণের মাধ্যমে জানাযার পর তাজে দাফন করা হয় গ্রামের কবরস্থানে।
ফয়সাল আহমেদ শান্ত এর ফেসবুক বায়োতে লিখা ছিলো যে হৃদয় শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা লালন করে সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না , কিন্ত তিনি যে তার আকাংখিত সেই শাহাদাৎ এর মর্যাদা লাভের মাধ্যমে প্রভুর নিকট চলে যাবেন তার নিকটজনের কেউ হয়তো বুঝতে পারেনি, তার শাহাদাতের পথ ধরে যে বাংলার জনপদ স্বৈরাচার মুক্ত হবে তিনি হয়তো চিন্তাও করেনননি। ফয়সাল আহমেদ শান্তর হত্যাকারীদের সঠিক বিচার হলে একমাত্র ছেলেকে হারানো পিতা-মাতা, আদরের ছোট বোন হয়তো স্বান্তনা পাবেন বাকিটা সময়।